পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি, বিতর্কে মন্ত্রীর বক্তব্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাস, ট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন থেকে নানা নামে এ অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগ রয়েছে, এই চাঁদাবাজির পেছনে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের একাংশ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য জড়িত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয় বলে জানান পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষণায় হাজার কোটি টাকার চিত্র

২০২৪ সালের ৫ মার্চ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই অর্থের ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা।

গবেষণায় আরও বলা হয়, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা সম্পৃক্ত; এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত।

কোথায় কত আদায়?

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাবে—

  • দেশে সিটি বাস প্রায় ৮ হাজার; প্রতিদিন গড়ে ৮০০ টাকা করে আদায় হলে মোট প্রায় ৬৪ লাখ টাকা।

  • দূরপাল্লার বাস ৬০ হাজারের বেশি; প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টাকা হিসেবে প্রায় ৩ কোটি টাকা।

  • সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ট্রাক; প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার টাকা করে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

  • রাজধানীতে ১৮ হাজার সিএনজি; প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে প্রায় ২৭ লাখ টাকা।

  • চট্টগ্রামে ১৫ হাজার সিএনজি; প্রতিদিন ৮০ টাকা করে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

  • ঢাকায় প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা; প্রতিদিন ১৫০ টাকা হিসেবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

  • ঢাকার বাইরে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা; প্রতিদিন ৮০ টাকা হিসেবে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে প্রতিদিন আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

মন্ত্রীর বক্তব্যে বিতর্ক

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক মতবিনিময় সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, “সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো।”

তিনি আরও বলেন, কেউ দিতে না চাইলে বা বাধ্য করা হলে সেটিকে চাঁদা বলা যায়; তবে মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে।

মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির দাবি

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি–এর মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “চাঁদা ও চাঁদাবাজি—দুটোই সড়কে আছে। সব পরিবহনে না হলেও বেশিরভাগ পরিবহনকে বিভিন্ন খাতে চাঁদা দিতে হয়।”

তিনি দাবি করেন, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্যও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ব্যবস্থা ও ক্যামেরাভিত্তিক মামলা চালু করলে চাঁদাবাজি কমানো সম্ভব বলেও মত দেন তিনি।

প্রভাব পড়ছে বাজারে

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়ায়। পণ্য পরিবহন খরচ বাড়ায় বাজারে দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, চাঁদা না দিলে গাড়ি চলতে দেওয়া হয় না; কখনও ভাঙচুর বা মারধরের হুমকিও দেওয়া হয়। বিভিন্ন টার্মিনাল, ট্রাক স্ট্যান্ড ও রুটভিত্তিক স্থানে নতুন নতুন নামে অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমঝোতার নামে আদায় হওয়া অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি। নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে জনমনে।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই

প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!