রাজনীতিতে সমালোচনা অতিবজরুরী একটি গনতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিতে সমালোচনা থাকবেই।একটি কার্যকর গণতন্ত্রে শাসকদল ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের অবকাশ থাকা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কির মতে, "গণতন্ত্র মানেই হলো সম্মতির ভিত্তিতে শাসন, যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য।" কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমালোচনার সেই সুস্থ ধারাটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে কখনো কখনো এই সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং অশালীন শব্দচয়ন, কটুক্তির পর্যায়ে চলে যায় যা রাজনৈতিক ও গনতান্ত্রিক শিষ্টাচারে মোটেও কাম্য নয়। আর আমাদের রাজনীতিতে এই আক্রমণাত্মক নীতি সবচেয়ে বেশি প্রচলন শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে। শেখ হাসিনার পনের বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের সংসদ থেকে রাজপথ সব জায়গায় ছিল রাজনৈতিক সমালোচনার নামে নানান ধরনের অশ্লীল মন্তব্য ও কটুক্তি শেখ হাসিনার উৎসাহ ও মদদে তার দলের উচ্চ পার্যায়ে নেতা থেকে শুরু করে তৃনমুলের কর্মী পর্যন্ত এই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল অশালীন কটুক্তি করতে দ্বিধা করেন নাই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, যখন কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর ভাষাগত সহিংসতা চালায়, তখন তা তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো সমাজকাঠামোতে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা তৈরি করে। যার সবচেয়ে বেশি শিকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা। যা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের সেই অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ রাজনীতির অবসান ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের আশাহত করছে। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক আগ থেকেই আমরা লক্ষ্য করলাম অতীতের ন্যায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে একে অপরের সেই একই ধরনের উচ্ছৃঙ্খল অশালীন কটুক্তি যা আমাদের প্রত্যাশার সম্পুর্ন বাহিরে। অতি সম্প্রতি জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বিএনপির চেয়ারপার্সন ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে দেওয়া একমবক্তব্যে অশালীন কটুক্তিমূলক মন্তব্য করেছেন। যা নিয়ে চলছে রাজনৈতিক শিবির থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা, সমালোচনা ও প্রতিবাদ । কিছু কিছু অতিউৎসাহীর এই প্রতিবাদে ভাষা এতটাই জঘন্য যে তা কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে উচ্চারণ করা হয়তো সম্ভব নয়। বাস্তবে একটি গনতান্ত্রিক দেশে কোন রাজনৈতিক নেতার মুখে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান সেই সাথে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অশালীন কটুক্তি কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। রাশেদ প্রধানের এমন কটুক্তিপূর্ন মন্তব্যে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সেই দায়িত্ববোধ থেকেই রাশেদ প্রধানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে করা কটুক্তিপুর্ন মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে রাশেদ প্রধানের কটুক্তিপূর্ন মন্তব্যের প্রতিবাদে আজ একটি বিশেষ শ্রেনী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত কাঁপাচ্ছন। রাশেদ প্রধানের বাড়ীর সমানে প্রতিবাদের নামে মব সৃষ্টি করে তাকে নানা ভাবে হেনস্তার চেষ্টা করছেন। এমকি মব সৃষ্টির কারীদের রোষানলে পরে রাশেদ প্রধানের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) জনী নন্দীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। আজ যারাই জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে রাশেদ প্রধানের করা কটুক্তির প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ কাঁপাচ্ছেন তাদের অনেকের অতীত ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। যখন বিগত শেখ হাসিনার শাসনামলে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে তার অধস্তন অধিকাংশ ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জনাব তারেক রহমানকে নিয়ে নানা ধরনের অশালীন কটুক্তি ও অমর্যাদাকর বিশেষণে ভূষিত অনবরত করেই গেছেন তখন এই প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো কোথায় ছিল? তারা কি তখন কোন প্রতিবাদ করেছেন ? না মোটেই না বরং তাদের অনেকেই তখন শেখ হাসিনার কাছ থেকে সুবিধা লুটতে শেখ হাসিনা গুণকীর্তনে ব্যস্ত ছিল। যারা আজ সময়ের পরিবর্তনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতি অতি দরদ দেখাতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে যেই তৈলমর্দন করেছে সেই ভুমিকায় ই অবতীর্ণ হয়েছে। রাজনীতির এই দ্বিচারিতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাজনীতির মাঠে ইট মারলে পাটকেলটি যে নিজের গায়ে এসে পড়তে পারে, এই সাধারণ সত্যটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডাক্তার শফিকুর রহমানের মতো একজন প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এনপিপির নেতা ও তরুন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর মত উদীয়মান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আজ সরকার দলীয় শিবিরের সেই অতিউৎসাহী সুবিধাভোগী অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ রাজনৈতিক মাঠে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ নামে অভিহিত করছেন তাদের নিয়ে নানা ধরনের কটুক্তি অনবরত করেই যাচ্ছেন তারা কি আদৌও রাজনৈতিক শিষ্টাচার মানছেন ? ডাক্তার শফিকুর রহমান বা হাসনাত আবদুল্লাহদের মত রাজনীতিবিদদের নিয়ে নানান কটুক্তি করার পর ও যারা নিশ্চুপ থাকেন বা সমর্থন দেন, তাদের নৈতিক অবস্থান কি আজ সংকটের মুখে নয়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় 'সিলেক্টিভ মোরালিটি' বা বৈষম্যমূলক নৈতিকতা, যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদী বিভাজন তৈরি করে।
রাজনীতিতে ব্যক্তি আক্রমণ যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোনো পক্ষই নিরাপদ থাকে না। আজ তারেক রহমানের অনুকূল সময় চলছে বলে তাঁর পক্ষে বিপুল জনসমর্থন ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুঃসময়ে যারা এই অশালীন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তারা আজ উপেক্ষিত। রাশেদ প্রধানের বাড়ির সামনে যারা আজ ভীড় জমিয়ে মব সৃষ্টি করে আইনকে নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন, তারা কি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল? সংবিধান অনুযায়ী অপরাধের বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়, কোনো উশৃঙ্খল মব বা ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়। মব কালচার বা উন্মত্ত জনতা যখন বিচারকের ভূমিকা পালন করতে চায়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতার বলয়ে আছেন বা অনুকূল পরিবেশে আছেন, কাল তারা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবেন এটাই প্রকৃতির নিয়ম । যার জলন্ত প্রমান চব্বিশের গনঅভ্যুত্থান ও শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ সরকারের ঐতিহাসিক পতন ও পলায়ন।
তাই রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা কেবল আদর্শিক বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষারও কবচ। কোনো নেতাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি সেই মন্তব্যের প্রতিবাদে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করাও সমানভাবে নিন্দনীয়।
বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা, তারা দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন। কোনো রাজনৈতিক বিরোধ বা মন্তব্যের জের ধরে যেন কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় এবং মব কালচারের মাধ্যমে কেউ যেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজর দেওয়া প্রয়োজন। পরিশেষে, আমাদের রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের প্রতি আহ্বান থাকবে ঘৃণা ও কটূক্তির রাজনীতি পরিহার করুন। যুক্তি দিয়ে যুক্তির মোকাবিলা করুন, ভাষা দিয়ে নয়। শহীদ জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জনাব তারেক রহমানের প্রতি যেমন সম্মান কাম্য, তেমনি দেশের অন্য সকল রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিও ন্যূনতম সৌজন্যবোধ বজায় রাখা জরুরি। যদি আমরা আজ এই অশালীন মন্তব্যের সংস্কৃতি বন্ধ করতে না পারি, তবে আগামীর রাজনীতি আরও বেশি বিষাক্ত হয়ে উঠবে। প্রতিহিংসার আগুন কাউকে রেহাই দেয় না। তাই সুস্থ গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং একটি সুন্দর আগামীর জন্য আমাদের এখনই রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পথে ফিরতে হবে। আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখে মব কালচার বন্ধ করা এবং বাকস্বাধীনতার নামে অশ্লীলতা রোধ করাই হোক আমাদের বর্তমান রাজনীতির অঙ্গীকার।
লেখক : ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!