ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট: রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামবাংলায় খেজুর রস সংগ্রহের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভোরের শিশিরভেজা সকালে কাঁচা খেজুর রস পান বহু মানুষের কাছে ঐতিহ্য ও আনন্দের অংশ হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে মারাত্মক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি—যা অজ্ঞাতসারে প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অসচেতনভাবে সংগৃহীত কাঁচা খেজুর রসের মাধ্যমে মানুষ নিপাহ ভাইরাসসহ বাদুড়বাহিত বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে এই ঝুঁকি বাড়লেও, মাঠপর্যায়ে সচেতনতা ও নজরদারি এখনো অপর্যাপ্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাছিরা খেজুর গাছে মাটির হাড়ি বা কলস ঝুলিয়ে রাতে রস সংগ্রহ করেন। তবে এসব হাড়ির মুখ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খোলা থাকে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে খাদ্যের সন্ধানে আসা নিশাচর বাদুড়, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী সহজেই এসব হাড়ির কাছে আসে।
স্থানীয় গাছি মো. জাদু বলেন, “রাতে কুয়াশা থাকলে হাড়ির দিকে নজর রাখা খুব কঠিন। অনেক সময় সকালে গিয়ে দেখি হাড়ির কিনারে বাদুড়ের লালা বা মল লেগে আছে। সব সময় তা বোঝাও যায় না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাদুড় হাড়িতে বসে রস পান করার সময় লালা, মল ও মূত্রের মাধ্যমে ভাইরাস রসে মিশে যেতে পারে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে,
বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করলে তা দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত হানে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে কাঁচা বা অপরিশোধিত খেজুর রস সরাসরি পান করা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
তারা জানান, অতীতে দেশে বাদুড়বাহিত ভাইরাস সংক্রমণে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যার সঙ্গে কাঁচা খেজুর রস পান করার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সচেতনতা নেই, ঝুঁকি বাড়ছে
মাঠপর্যায়ে দেখা যায়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো এই ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত নয়। অনেকেই কাঁচা খেজুর রসকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও নিরাপদ মনে করে নিয়মিত পান করছেন। অথচ হাড়ির মুখ ঢেকে রাখা, রস ফুটিয়ে খাওয়া বা বিক্রির আগে প্রক্রিয়াজাত করার মতো মৌলিক সতর্কতাও মানা হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেজুর রস বাঙালির ঐতিহ্য হলেও নিরাপদ সংগ্রহ ও ভোগ নিশ্চিত না হলে এই ঐতিহ্যই মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
খেজুর রস সংগ্রহের সময় হাড়ির মুখ জাল বা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে
কাঁচা রস সরাসরি পান না করে অবশ্যই ভালোভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ প্রয়োজন
তাঁরা বলেন, সামান্য সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে এই নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই
প্রথম মন্তব্য করার জন্য আপনাকে স্বাগতম!